যখন বিদেশ যাই তখন বিমানবন্দরে একটি-দুটি বিমানকে এতিমের মতো দেখি
এবার দেখলাম ১০-১২টা
আবার স্ক্রিনে যে আগমন-বহির্গমনের বার্তা দিচ্ছিল তাও কিন্তু এক স্ক্রিনে হচ্ছিল না
বাংলা-ইংরেজি আলাদা দেখাতে বেশ কয়েকটি স্ক্রিন লেগে যাচ্ছিল
আমাদের জনসংখ্যা সিঙ্গাপুরের ৪০ গুণ বেশি হতে পারে ফ্লাইট নিশ্চয়ই ৪০ ভাগের এক ভাগ
একই কথা থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া কিংবা কোরিয়ার তুলনায় বলা যাবে
এটার অর্থ হলো আমরা এখনো ধর্তব্যের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠিনি
যার ফলে দেখা যায় বিদেশি পত্রিকায় আবহাওয়ার বার্তা যখন দেখায় তখন কুয়ালালামপুর ব্যাংকক কলকাতা দিল্লি করাচির আছে কিন্তু ঢাকার নেই
স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকায়ও ব্যাংকক ভারত আছে বাংলাদেশ নেই
এভাবে পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম জনবহুল দেশ নানা গণনায় শুধু বিশ্বেই নয় আমাদের অঞ্চলেও অবহেলিত
ঢাকা থেকে কলম্বো যাওয়ার সহজ পথ হলো ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুর হয়ে
ঢাকা থেকে সরাসরি যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই
যা হোক রাত পৌনে নয়টায় যখন কুনমিং শহরে পৌঁছলাম তখন তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি তাই যথেষ্ট শীত শীত করছিল
উপরন্তু রয়েছে পরবর্তী ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা
সানির ছবি মাত্রাতিরিক্ত বাচ্চা বয়সের জন্য নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব
তারপর আবার বাংলাদেশি পাসপোর্ট
পরিশেষে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার হাত থেকে পরিত্রাণ যদিও পেয়েছি ভাইয়ের কাছে কোরিয়া বেড়াতে যাওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো
সৌভাগ্যবশত কুনমিংয়ে বসবাসকারী ব্যবসায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের সাহায্যে চায়না ইস্টার্নের সৌজন্যে একটি হোটেলে থাকা চায়নিজ নুডলস খাওয়া এবং সকাল নয়টায় সাংহাইয়ের ফ্লাইট এবং আবার এয়ারপোর্টে ফেরা
এর মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের আমন্ত্রণকারী ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উকে কিছুই জানাতে পারিনি
২০০৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে তাঁর দল বাংলাদেশে এসে একবার ছাড়া প্রতিবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে
শুধু তা-ই নয় সারা বছর নানা উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নিয়মিত ই-মেইল করেন
কখন ইনফরমেটিকসের প্রস্তুতি নিতে হবে কোন সাইটে ভালো ভালো সমস্যা রয়েছে
মোটের ওপর বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা আরও কীভাবে প্রোগ্রামিং-ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে তা নিয়ে তাঁর চিন্তার শেষ নেই
প্রতিবছর নানা সুভেনির নিয়ে আসেন আমাদের জন্য
আমরা যখন প্রায় ১২টার সময় সাংহাই বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার গেটে এসেছি কিঞ্চিৎ উদ্বেগ নিয়ে লক্ষ করলাম দুই হাত আকাশে তুলে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা যে করছেন ১৯ বছরের তরুণের মতো তিনিই হলেন আমাদের আমন্ত্রণকারী ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারের অধ্যাপক যাঁর ছাত্ররা একাধিকবার আইসিপিসির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে মেডেল পেয়েছে
আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগের দিন রাতেও এসেছিলেন
আমাদের থাকার যাতে অসুবিধা না হয় কাজাখস্তানের কাছাকাছি চীনের বাসিন্দা সদ্য স্কুল শেষ করা ইংরেজিতে দক্ষ আরাফাতকে নিয়ে এসেছেন
আরাফাতের চমৎকার ইংরেজিতে আমরা আশ্বস্ত বোধ করলাম যা বোঝাতে চাইব আরাফাত তা-ই বুঝবে
অধ্যাপক উর আতিথেয়তার আন্তরিকতার মাত্রা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না
এই আপ্যায়নে সর্বক্ষণই নিজেকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর মনে হবে
ভাষার বাঁধ ডিঙিয়ে তাঁর আন্তরিকতা যে ছাপ রাখে তা চিরদিন মনে থাকবে
আমাদের সামান্য আরাম-আয়েশের জন্য ১২-১৩ বছর বয়সী ছেলের মতো দৌড়ঝাঁপ দিতেও তাঁর আগ্রহের কমতি নেই
আমাদের আবীর যে এবার ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে রৌপ্য পদক পেল তার জন্য নানা উদ্যোগের কথা অধ্যাপক উ আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন
শুধু তা-ই নয় আবীর পুরস্কার পাওয়ার পর আমি না জানালেও তিনি প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সবাইকে
অধ্যাপক উর মতো সফল মানুষ হয়তো বাংলাদেশেই রয়েছেন যাঁদের মূল্যায়ন সাধারণত যথাযথ হয় না
কারণ যারা দৌড়ঝাঁপ করে যেকোনো সমস্যায়ই মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের বড় মাপের ভাবি কী করে অথচ বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়—আমরা কি এ কথায় বিশ্বাস করি আমাদের দেশকে উন্নত করতে হলে অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে হলে যারা কাজ করে তাদের এগিয়ে রাখতে হবে কথাসর্বস্বদের না দিলেও চলবে
যত দিন আমরা তা করতে পারব না তত দিন অগ্রগতি মরীচিকার মতো থেকে যাবে
মোহাম্মদ কায়কোবাদ অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস
গন্তব্য ঢাকা
মোহময় এক গ্রামের মানুষ
গ্রামটি মোহময়
চারপাশে সবুজের ছায়া আর বাড়ির পাশের একচিলতে পুকুরে টলটলে জল
ঘরে স্ত্রীর সঙ্গ আর সন্তানদের উচ্ছ্বসিত হাসির কলরব শুনতে কখনোই বিরক্তি জন্মায়নি
কিন্তু জীবনের প্রয়োজন কি ভালোবাসার টান মানে আর তাই হাজার হাজার মানুষকে আত্মার টান উপেক্ষা করে পেটের টানে পড়ে থাকতে হয় এই ইট-কাঠের নগর ঢাকায়
আবদুস সাত্তার তাদেরই মতো একজন
যিনি একেবারে পেটের দায়ে না হলেও কিছু স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদে ছেড়ে এসেছেন আপন ঘর ও আপনজনদের
এই পত্রিকা নিবেন পত্রিকা
সিগন্যাল বা রাস্তার জ্যামে দাঁড়িয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর জানালায় মুখ রেখে বিক্রেতারা যখন তারস্বরে চিৎকার করতে থাকে তখন আমরা অনেকেই বিরক্ত হই
একবার যদি রাগ দেখাই তো পরেরবার মুখ ফিরিয়ে রাখি
কেউ বা হয়তো কয়েকটা টাকার বিনিময়ে কিনেও নিই পত্রিকা
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখি এই কয়েকটা টাকার জন্যই দিন-রাত কষ্ট করে মানুষগুলো
কেউ একজন যদি একটি পত্রিকা কেনে তবেই সে তার দৈনন্দিন একমুঠো ভাত বা একটা স্বপ্নের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায়
আবদুস সাত্তার এমনই একজন পত্রিকা বিক্রেতা
কারওয়ান বাজারের মোড়ে থেমে যাওয়া গাড়িতে তিনিও মুখ বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন পত্রিকা নিবেন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পারকালুপুর গ্রামে বাড়ি আবদুস সাত্তারের
চারপাশে আমের বাগান মাথার ওপরে নীল আকাশ স্ত্রী রুলির ভালোবাসা আর ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে জীবন বেশ ভালোই কাটছিল
কিন্তু ওই যে স্বপ্ন
সেটাই তো নিয়ে এল ঢাকায়
দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে
আর ছেলেটা সদ্য কলেজ পাস করেছে
তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার জন্য জমানো কিছু টাকা নিয়ে চলে এসেছি ঢাকায়
ভর্তি করাতে যখন সব টাকা শেষ হয়ে গেল তখন ভাবলাম কিছু তো করতে হবে
তা না হলে ছেলের পড়াশোনা চলবে কী করে
তাই ঢাকাতেই থেকে যাওয়া
প্রথম যখন এলাম তখন কলা চানাচুর—এই সব বিক্রি করতাম কাওরান বাজারেই
সেইটা দিয়ে চালাতাম ছেলের পড়াশোনা
আমার ছেলেও অনেক কষ্ট করেছে
নিজে রিকশা চালিয়ে পড়াশোনা করেছে
এখন তো ওর ইংরেজিতে মাস্টার মাস্টার্স শেষ হয়ে গেছে
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে শামীম
এখন টিশানি গৃহশিক্ষকতা করে
আর কী একটা প্রাইভেট কিলিনিকে ক্লিনিক চাকরি করে বললেন সাত্তার
গ্রামই আমার কাছে বেশি প্রিয়
ঢাকার শব্দ গ্যাস ভালো লাগে না
গ্রামে আমরা অনেক ভালো ছিলাম
আমবাগানে আম কুড়িয়ে খাওয়া অনেক মজার
এই ঢাকার ছেলেমেয়েরা তো কোনো খেলাধুলা করে না
আমরা স্কুলে কত খেলাধুলা করেছি
আমি তো স্পোর্সম্যান ছিলাম
কত বল হাইজাম্প লংজাম্প খেলেছি
এখন সেসব দিন কোথায় যে গেছে নিজের গ্রাম্য জীবনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন আবদুস সাত্তার
আমার বাবার অনেক জমি ছিল
কিন্তু আমরা সাত ভাই দুই বোন তো
তাই ভাগ করার পর আমি আমার ভিটাটুকুসহ পেয়েছি প্রায় ছয় বিঘা
ওই দিয়েই আমাদের খেয়েপড়ে চলে যায়
ছেলেও পাঠায় ছোট দুই মেয়ের পড়ার খরচ
তাও ঢাকায় আছি কারণ মেয়ে দুইটার বিয়ে দিতে হবে ধরেন অনেক তো টাকা লাগবে
এভাবে কষ্ট করে যদি কিছু জমাতে পারি তাহলে মেয়েটার ভালো বিয়ে দিতে পারব
আর আল্লায় যদি দেয় তো একবার হজ করতে চাই
সে জন্যও তো অনেক টাকার দরকার
শরীর যখন চলছে তখন যত দিন পারি কাজ করি
দেখি হজের টাকা জোগাড় করতে পারি কি না
ছেলেটার তো পড়াশোনা শেষ হয়েছে দুটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে
ঘরে আছে এখন দুই মেয়ে আর এক ছেলে
দুই মেয়ের বিয়ে এবং নিজের হজ করার জন্য এই ৫৫ বছর বয়সে এসেও সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি করে চলেছেন হাড়ভাঙা পরিশ্রম
কষ্ট তো হয়ই
আগে পপ্পন পপকর্ন বিক্রি করতাম
এখন তো রোজার দিন তাই সকাল থেকে বিক্রি করি পেপার আর রাতে বিক্রি করি চানাচুর-বিস্কুট
আবার রুমালও বিক্রি করি
এখানে রাতে থাকি একটা মসজিদে
